ঝরাপাতার সংসার

প্রথম অধ্যায়
বিদায়, দোনেৎস্ক

দিনটা একদমই আর দশটা রবিবারের মতো না। মা চার্চে যায়নি। ভোরবেলাই দাদু বাসায় এসে হাজির। মুখে দুয়েক দিনের না কামানো দাড়িতে তাকে অন্যরকম লাগছে। দাদুর মর্যাদাবোধ বাড়াবাড়ি রকমের। সেই মানুষটার জন্য ব্যাপারটা রীতিমতো বেমানান। বাবাও আজ তার নাশতা নিয়ে অন্যদিনের মতো গোমড়া মুখে গজগজ করল না। শাশা বেনিচকাকে নিয়ে হাঁটতে যায়নি। এমনকি, যে ইগর রবিবার সকাল হলে আমার সঙ্গে দেখা না করে ছাড়েই না, তারও দেখা মিলল না।

আসলে গতকাল রাতেই পাড়ার একটা ফ্ল্যাটে কামানের গোলা এসে লেগেছে। সবাই বলছে, দোনেৎস্কে থাকা আর মোটেই নিরাপদ না। বাঁচতে চাইলে দূরে কোথাও সরে যেতে হবে। অথচ মা আর বাবা দুজনেই তাদের সারাটা জীবন কাটিয়েছে এই মহল্লাতেই। শৈশবে একসঙ্গে খেলেছে পাড়ার পার্কে। তারুণ্যে একসঙ্গে সামলেছে আবেগের ঝড়। বড় হয়ে শুরু করে যুগলজীবন। তাদের কাছে এই শিকড় উপড়ে ফেলা মোটেও সহজ না।

যাই হোক, শহর ছেড়ে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বাসার সবাই দুই ভাগ হয়ে গেছে। মা যাওয়ার বিপক্ষে। তার সোজা কথা : যেতে চাইলে তোমরা আমার লাশের ওপর দিয়ে যাও।

মৃতদেহের কথাই যখন উঠেছে— কাছের এক কবরস্থানেই শুয়ে আছেন মায়ের বাবা–মা। বয়স কারোই বেশি হয়নি। নানু কাজ করতেন কয়লাখনিতে। খনিতে কাজ করা লোকজনের বেশি বাঁচার কথাও না। তবে সোভিয়েত সরকার আয়ু কেড়ে নেওয়ার দাম চুকাত ভালো বেতন দিয়ে। আমার ইঞ্জিনিয়ার দাদুর বেতন যেখানে ছিল মাসে ১৮০ রুবল সেখানে কয়লাখনিতে কাজ করে নানু মাসে কামাতেন পাঁচশর বেশি। এমনকি আমার নানি দোনেৎস্ক শহরে ট্রাম চালিয়ে পেতেন ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে বেশি বেতন।

বেতন থেকেই পরিষ্কার, আমার নানা আর দাদার পরিবারের আর্থিক অবস্থার ব্যবধান ছিল বিস্তর। তবে মায়ের কাছে শুনেছি, কিশোর বয়সে তাদের প্রেমের সম্পর্কে জীবনযাত্রার ফারাককে কখনো প্রভাব

ফেলতে দেয়নি সে। তবে বাবা বলে ঠিক উল্টো কথা। মায়ের পরিবার কীভাবে নতুন ঝকঝকে ভলগা গাড়ি নিয়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে ক্রাইমিয়া যেত, সেইসব গল্প মা কত গর্ব করে বলত—বাবা নাকি আজও তার প্রতিটা খুঁটিনাটি মনে রেখেছে।

বাবারও অবশ্য প্রতি বছর ক্রাইমিয়া যাওয়া হতো। তবে সেটা অচেনা মানুষে ঠাসা দুর্গন্ধময় ট্রেনের বগিতে, যেখানে ভদকা আর সালোর প্রতি যাত্রীদের ভালোবাসা অনেক সময় খাঁটি কমিউনিস্ট দেশপ্রেমিকের আদর্শিক নিষ্ঠাকেও হার মানাত। শেষ পর্যন্ত বাবাও নিজেদের গাড়িতে চড়ার সুযোগ পেয়েছিল। তবে সেটা কোনো চকচকে ভলগা নয়, একটা জিগুলি। দাদু আজ সকালে সেই গাড়িটাই চালিয়ে এসেছেন। এই ফাঁকে বলে রাখি, বাবার কাছেই শুনেছিলাম, বাইরের দুনিয়ায় জিগুলিকে লাডা নামে চেনে। ষাটের দশকে ইতালির ফিয়াটের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের একটা মডেলের ভিত্তিতে নাকি সোভিয়েতরা বানায় এই গাড়ি।

কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা সামাজিক দিন এলেই মা তার বাবা-মায়ের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে যায়। বাদ পড়ে না মে দিবস, নারী দিবস বা বিজয় দিবসের মতো দিনগুলোও। সোভিয়েত আমলে ধর্মকর্মের বিশেষ বালাই ছিল না। তখন অক্টোবর বিপ্লব দিবস আর পিতৃভূমি সুরক্ষা দিবসের পাশাপাশি এই তিনটা দিনই ছিল সবচেয়ে বড় উৎসবের সময়। এই উৎসবের দিনগুলো এখনো বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো দারুণ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় মাকে।

অবশ্য ধর্মীয় দিবসে কবরস্থানে যাওয়া দেখলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, মা যেন কবরের পাশেই দাঁড়িয়ে বাবা-মাকে নতুন করে ধর্মে দীক্ষা দিচ্ছে—মরণোত্তর দীক্ষা! কারণ বেঁচে থাকতে তার বাবা-মায়ের ঈশ্বরে বিশেষ বিশ্বাসটিশ্বাস ছিল না।

বাবা-মায়ের কবর থেকে উঠে আসা নীরব ফিসফিসানি যেন দোনেৎস্কের সঙ্গে কঠিন এক বাঁধনে মাকে বেঁধে রেখেছে। এ বাঁধন একই সঙ্গে ভালোবাসার সুখ আর হারানোর বেদনার অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা। মা তাই দোনেৎস্কে থেকে যাওয়ার জন্য একরকম কাকুতিমিনতিই শুরু করল। তাতে দাদু বেশ খেপেই গেলেন।

‘দেখো, ভাসিয়া দারুণ কর্মী ছিল। ওর চেয়ে ভালো খনির কাজ আর কেউ পারত না তখন। ও মানুষের জন্য কাজ করেছে। খেটেছে মানবতার জন্য। ওর জীবনের একটা অর্থ ছিল, ছিল উদ্দেশ্যও। কিন্তু ওই কবরখানার কথা যদি বলো—বসন্তে নতুন করে ঘাস গজানো আর শীতে মরে যাওয়া ছাড়া তো কিছু দেখি না আমি,’ রাজ্যের বিরক্তি দাদুর গলায়।

মার মুখে কথা জোগাচ্ছে না। দাদুর কথায় সে হতভম্ব। চোখের কোণে পানি জমছে মনে হলো। দাদু যেন বিব্রতই হলেন মার এ প্রতিক্রিয়ায়।

‘আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি, লুদা। কিন্তু যুদ্ধ তো কাঁদতেও দেয় না। যুদ্ধ চোখের জল শুকিয়ে পাথর বানিয়ে দেয়। তাই বলি, যতক্ষণ কাঁদতে পারছ, পালাও,’ বললেন দাদু।

Battle of Kursk: Photo Credit Yefim Kopyt

দাদুর কাছে যুদ্ধ নতুন কিছু না। দোনেৎস্কে যখন বিশ্বযুদ্ধের আঁচ পৌঁছায়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ। কুরস্কের যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন তার বাবা। দাদুর অবশ্য সেসব কথা মনে পড়ে খুব কম। তবে মনে আছে সারাক্ষণ খিদের জ্বালা আর মায়ের শূন্য চাউনির কথা। দোনেৎস্কের দখল আর মুক্তির সেই দুই বছরের কথা বলতে তার মনে আছে শুধু এইটুকুই।

স্তালিনের ভয়ংকর হোলোদমর প্রকল্পে এতিম হয়েছিলেন দাদুর মা। অদৃশ্য শক্তির হাতে এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়েছিল তার জীবন। ১৫ বছর বয়সে ইস্পাত কারখানার দমবন্ধ করা গরমে দিনে ১২ ঘণ্টা খেটে তার শৈশব শেষ হয়। ভবিষ্যৎ স্বামীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেখানেই।

দোনেৎস্ক দখলে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর তার দ্বিতীয় বাচ্চাটা মারা যায়। কয়েক মাস পরই তার স্বামীকে সামরিক বাহিনীতে তলব করা হয়— যুদ্ধ থেকে তিনি আর ফেরেননি। দোনেৎস্কে ফেরা এক আহত সৈনিক একদিন দাদুর মাকে মৃত স্বামীর জুতোজোড়া দেখায়। এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেন। সব হারানোর পর দুনিয়ায় তার জীবনের একমাত্র যে ধন অবশিষ্ট ছিল—সে আমাদের দাদু।

জীবনের পরিহাসটা এমনই হয় হয়তো—যে মানুষটার শৈশব ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল যুদ্ধ, সে-ই বড় হয়ে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যায়। দাদু কোনো পেশাদার সৈনিক ছিলেন না, জোর করেও তাকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়নি। আফগান যুদ্ধে তিনি নিজেই নাম লিখিয়েছিলেন। সেখানেই তার পরিচয় হয়েছিল আঙ্কেল ভানিয়ার সঙ্গে। আজ বাবা আর দাদু যাচ্ছেন সেই আঙ্কেল ভানিয়ার কাছেই পরিস্থিতি সম্পর্কে পরামর্শ করতে।

দোনেৎস্কে আঙ্কেল ভানিয়াকে চেনে না, এমন মানুষ খুবই কম। কারও কাছে তিনি নব্বইয়ের দশকের কুখ্যাত অপরাধজগতের ‘ছাতা’ হিসেবে পরিচিত। অন্যদের কাছে তিনি দানশীল মানুষ, শিল্পপ্রেমী, আর স্থানীয় ফুটবলের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক যাকে ছাড়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হয়তো দোনেৎস্কমুখীই হতো না।

আঙ্কেল ভানিয়ার মতো শিল্পপতিদের কারণেই শিল্পশক্তির দিক থেকে দোনেৎস্ক এখনো ইউক্রেনের মাথার মণি হয়ে আছে। আঙ্কেল দাবি করেন, তার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। কিন্তু দোনেৎস্কে তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব আছে—এমন মানুষ বলতে গেলে নেই।

আফগান যুদ্ধের সময় দাদা ছিলেন ভানিয়া আঙ্কেলের মাথার ওপর নির্ভরতার ছায়া। একেবারে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ যাকে বলে। দোনেৎস্কের দুই ভিন্ন আদর্শের মানুষ, জীবনের দুই ভিন্ন সময়ে, দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তবু তাদের বন্ধুত্ব রক্তের সম্পর্ককেও হার মানাত।

দাদু ছিলেন একনিষ্ঠ অক্টোব্রিস্ট, পাইওনিয়ার আর কমসোমোল সদস্য। কমিউনিস্ট হিসেবে তার ভাবমূর্তিও ছিল একেবারে নিখুঁত। লম্বাচওড়া স্লাভ জাতের মানুষটাকে কেউ নিখুঁতভাবে শেভ না করে বের হতে দেখেনি। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান —এসবের আশপাশে থাকতেন না। কমিউনিস্টরা যাকে বলত ‘গরিব ভোলানোর আফিম’ সেই ধর্মেও মতি ছিল না তার।

অন্যদিকে, নেশাই ছিল আঙ্কেল ভানিয়ার কান্দাহারে পৌঁছানোর আসল কারণ। দোনেৎস্কে অবৈধ মাদকসহ ধরা পড়েছিলেন। বাধ্যতামূলক যুদ্ধে যাওয়া আর ঠেকায় কে! নামকাওয়াস্তে কিছু ট্রেনিং দিয়েই সোজা আফগানিস্তানে চালান। ট্রেনিং বলতে সম্বল কোনোমতে রাইফেল চালানো আর গ্রেনেড ছোড়ার জ্ঞান।

Returning from Afghanistan:Photo Credit Yuriy Somov

প্রায় দুপুর। বেনিচকাকে এখনো বাইরে হাঁটতে নেওয়া হয়নি। ছোট ভাই সাশা ওকে একা বাইরে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।

সবার আদরের কুকুর বেনিচকা। ওর পুরো নামটা বেশ গালভরা— বেনেডিক্ট আলেক্সান্দ্রোভিচ পেত্রোভ! মিশমিশে কালো বেনিচকা জাতে আধা ল্যাব্রাডর।

বেনিচকার ‘পালক বাবা’ আলেক্সান্দর নিকোলায়েভিচ পেত্রভ ওরফে সাশার নবম জন্মদিন ছিল গত বছর। সেবার খাঁটি ল্যাব্রাডর ছানা ছাড়া অন্য কিছুই  উপহার হিসেবে নিতে রাজি হয়নি সাশা। সে সুবাদেই পেত্রোভ পরিবারে আসা বেনিচকার।   মা আর ছয় ভাইবোনের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার সময় তুলতুলে ছানাটার বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস।

 শেষ পর্যন্ত বেনিচকাকে পার্কে নিয়ে যাওয়ার ভারটা সাশা আমার ওপরই চাপাল। পার্ক অবশ্য কাছেই।  সকালের চাপে বেনিচকা এমনিতেই ছটফট করছিল—দেয়ালে দেয়ালে লাফানোই শুধু বাকি ছিল।

পার্কটাকে আমার আজ অচেনা কোনো জায়গা মনে হচ্ছে। বেঞ্চগুলো ফাঁকা। প্রেমিক-প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে খুনসুঁটি চোখে পড়লো না। স্কেটবোর্ডের নতুন কায়দা দেখিয়ে বাহবা কুড়ানো বাচ্চাগুলোই বা কই?  বাতাসে ঢেউ তুলছে না বেহালা কি গিটারের সুর। উধাও শখের দাবাড়ুরাও। বিশেষ করে শেষের ব্যাপারটায় মনটা সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল আমার।

স্বাভাবিক সময়ে এই পার্কটা দাবা খেলতে আসা দেদুশকাদের দখলেই থাকত। নিষ্কর্মা বুড়োগুলোর দিনের বড় অংশ কেটে যেত এখানেই।এখন জায়গাটা অস্বাভাবিক রকম খাঁ খাঁ করছে। অথচ রোদবৃষ্টি যাই থাকুক, দিনের শেষ আলো থাকা পর্যন্ত এ জায়গাটা কমবেশি গমগম করতো।

পার্কটা আসলে ছিল হেরে যাওয়া মানুষগুলোর আশ্রয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ক্লান্ত, আশাহীন শিল্পশ্রমিকেরা এখানে এসে কিছুক্ষণের জন্য পুরোনো ক্ষতগুলো ভুলে থাকার চেষ্টা করত। পেনশনের ক্ষীয়মান ক্রয়ক্ষমতা যাদের সঙ্গে নীরবে প্রতারণা করে চলেছিল, তাদের কাছে এই পার্কই ছিল জীবনের হাজারো চাপ থেকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার নিরাপদ জায়গা।

কত বিবর্ণ স্বপ্নের যে কবর হয়েছে এখানে! ভাঙা অহংকার আর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একরকম সন্ধি করত দেদুশকারা এখানেই। বেঁচে থাকার একটা ছোট্ট কারণও যেন খুঁজে পেত তারা এই পার্কে।

দাবাটা শুধু খেলা ছিল না তাদের কাছে। সাদাকালো ছকের সেই দাবার বোর্ডে বুড়োগুলোই ছিল নিজেদের রাজ্যের রাজা, অন্যের হাতের ঘুঁটি নয়। দিনের শেষ আলোর মতোই এই জায়গাটায় জীবনের একটা মৃদু ঝিলিক ছিল—নরম, ক্ষণস্থায়ী, অথচ অদ্ভুত সুন্দর।

আঙ্কেল ভানিয়ার কাছ থেকে বাবা আর দাদু খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর নিয়ে ফিরলেন। দোনেৎস্কে যুদ্ধ নাকি আরও অনেক দিন চলবে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো  লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দিনে দিনে তা আরও খারাপের দিকে যাবে।

ভানিয়া আঙ্কেল বাবাকে তিনজন বিদ্রোহী নেতার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছেন।  বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় কোনো সমস্যায় পড়লে  উনাদের কথা বললেই হবে। নামগুলো ফোনে সেভ করতে মানা করেছেন আঙ্কেল। এমনকি স্ক্রিনশটও রাখা যাবে না।

বাবার হাতে একটা ছোট লাইটারও ধরিয়ে দিয়েছেন আঙ্কেল। বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শেষ চেকপোস্টটা পার হওয়া মাত্র নাম-ঠিকানা লেখা কাগজটা পুড়িয়ে ফেলতে। একেবারে হলিউডের থ্রিলার ছবির কায়দা যেন!

ভলনোভাখা রাইওন এলাকার এক গ্রামে মায়ের এক খালার একটা দাচা (সাবেক সোভিয়েতভুক্ত অঞ্চলের খামারবাড়ি) আছে।  সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলের পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার ভেতরে দাচাটা। মা এরই মধ্যে তার খালার সঙ্গে কথা বলেছেন। ঠিক হয়েছে, আজ সন্ধ্যায়ই উনার কাছ থেকে দাচার চাবি নিয়ে নেব আমরা।

স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দাচাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অন্য অনেক ইউক্রেনীয় পরিবারের মতো মা’র খালাও তখন টিকে থাকার লড়াই করছিল। সেই সময় আলু আর বাঙ্গি ফলিয়ে এই দাচাই ছিল তাদের বাঁচার ভরসা।

একসময় মা’র খালাতো ভাইবোনেরা বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। ওদের কাছে কদর কমে যায় গ্রামের দাচার। সত্যি বলতে কী, পরে আর দাচার নামও শুনতে পারতো না ওরা। ওদের কাছে দাচা বলতেই তো সেই দুঃসময়ের স্মৃতিভরা শৈশব। খেত থেকে মাটি খুড়ে আলু তোলা আর হররোজ তাই দিয়ে খিদে মেটানোর সেই কষ্টের দিন।

ভাগ্যের কী খেল! তিন দশক পরে সেই দাচাই আবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে আমাদের। বাবা আর মা মারিউপোলে চাকরিবাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকতে হবে আমাদের। এখনো ইউক্রেনের দখলে থাকা কাছাকাছি সবচেয়ে বড় শহর মারিউপোল।

প্রথমে ঠিক হয়েছিল সূর্য ওঠার পরপরই আমরা শহর ছাড়বো। তাতে পাড়ার লোকজনের প্রশ্নের মুখে পড়া এড়ানো যাবে। কিন্তু বাবা বলছে, ব্যাংক থেকে টাকা না তুলে যাবে না। এটিএম মেশিনে টাকা নেই। রোববার বলে আজ ব্যাংকও বন্ধ। তাই কাল সকালেই ব্যাংক খুললে প্রথম কাজ হবে সব হৃভনিয়া তুলে ফেলা।

দুই মাস ধরে মা’র অফিস রুশ রুবলে বেতন দিচ্ছে। সেই টাকাগুলো বাসাতেই রাখা ছিল। বাবা ঠিক করেছে, হৃভনিয়া আর রুবল—দুটোই ডলার বা ইউরোতে বদলে ফেলবে। ব্ল্যাক মার্কেটে দাম বুঝে যেটা ভালো হয়।

দাদু আর দাদি কেউই আমাদের সাথে যাচ্ছেন না। সেটা কেউ আশাও করিনি আমরা। বাবা-মাও অবশ্য তাদের খুব বেশি জোর করার চেষ্টা করেনি। বেশ বয়স হলেও মানুষ দুটোর ভালোই প্রাণশক্তি আছে এখনো। কিন্তু দোনেৎস্ক ছাড়লে তারা বাঁচবেন না। সত্তরটা বছর  ধরে তাদের মনপ্রাণ, অস্তিত্ব জুড়ে আছে এ শহর। এই চিরচেনা ছন্দের দিনযাপনেই স্বস্তি বুড়োবুড়ির। শ্রান্ত ক্লান্ত শরীরদুটো তারা বয়ে চলেছেন এর জোরেই। এই সময়ে এসে শেকড় উপড়ালে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হয়তো নিভে যাবে।

দাদী মারাত্মক পার্কিনসন্সে ভুগছেন। তার কষ্ট একেকসময় এমন অসহ্য হয়ে ওঠে যে বলার না। মজা করে সে বলে,  ঈশ্বর যদি কামানের গোলায় তার মৃত্যু লিখেই রাখত,  তাহলে আর এই দীর্ঘদিনের ব্যাথার আজাব চাপিয়ে দিতেন না। বলে রাখা দরকার, ঈশ্বরের সঙ্গে দাদীর সম্পর্কটা জমেনি কোনোদিন।

Zhiguli: Photo credit Berthold Werner 

মা জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করছে। চারজন মানুষ আর চারপেয়ে বেনিচকাকে বসানোর পর ঝিগুলিতে মালপত্র রাখার খুব বেশি জায়গা থাকবে না। আজ যেন বাড়ির প্রতিটা জিনিসের বিচারদিন—গাড়িতে জায়গা পাওয়ার জন্য সবাই নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে।

এমন একটা সময় গেছে যখন বাসার কেউ মা’র প্রিয় ডিনার সেটের কিছু একটা ভাঙলে মা চেচামেচি করে বাড়ি মাথায় করতো। চরম রাগ নিয়ে যা রান্না করতো, সে খাবার মুখে তোলা যেত না। সারা রাত তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকতো।

আজ সেই প্রাণের ডিনার সেটের দিকেই মা’র খেয়াল নেই। বাবার কিস্তিতে কেনা লম্বা স্টেইনলেস স্টিলের ফ্রিজটা সঙ্গত কারণেই পাত্তা পাচ্ছে না। এমনকি গাড়িতে ঠাঁই পেল না হাতে নকশা করা চমৎকার ড্রেসডেনের ফ্লাওয়ার ভাসটাও। অথচ বাসায় কেউ বেড়াতে এলে মা তাদের মুখে জিনিসটার তারিফ না শুনে ছাড়ত না।

দেখা গেল,  শেষ পর্যন্ত গাড়িতে জায়গা পাচ্ছে শুধু সেই জিনিসগুলোই, যেগুলো ছাড়া পেত্রোভ পরিবারের অস্তিত্বই যেন অচল। জন্মসনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংকের কাগজপত্র, বাড়ির দলিল, দরকারি কাপড়চোপড়, বিছানার চাদর—এমনকি ওই আজব বালিশগুলোও।

অদ্ভুত লাগছে আরেকটা জিনিস দেখে। দিনের পর দিন সবার অলক্ষ্যে দেয়াল আর শোকেসে ধুলো জমতে থাকা কিছু জিনিস কীভাবে হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে ওঠে। সাশার জন্মের সময়ের ছোট্ট পায়ের ছাপ, বাবা-মার বিয়ের ছবি, ব্রেজনেভের হাত থেকে দাদুর অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার গ্রহণের ছবি, আমার স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের ছবি, দোনেৎস্ক জুনিয়র দাবা প্রতিযোগিতায় পাওয়া সাশার তামার তৈরি ‘স্বর্ণপদক’, আর ক্রাইমিয়ায় ঘুরতে যাওয়ার কয়েকটা ছবি—এসবের গাড়িতে জায়গা পাওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।

মা খুব যত্ন করে ছবিগুলো কাচের ফ্রেম থেকে খুলে নিচ্ছে। চোখের জলও মুছে নিচ্ছে ফাঁকে ফাঁকে। যুদ্ধ না বাঁধলে কখনোই বুঝতাম না এই ছোটখাটো স্মৃতিচিহ্নগুলো জীবনের সাথে এতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

মা বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পরার জন্য তার সেরা পোশাক কয়টা আর শখের সিঙ্গার সেলাই মেশিনটা সঙ্গে নিচ্ছে। এই শরতে কিয়েভের কিমোতে আমার আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শুরু হওয়ার কথা। সে জন্য মা ঠিক করেছে, তার কয়েকটা পুরোনো ড্রেস কেটে-ছেঁটে আমার মাপের করে দেবে, যাতে কিমোর “এলিট” ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে আমাকে একেবারে বেমানান না লাগে।

মার গোছগাছ শেষ হলে আমরা একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে দাদাবাড়ি গেলাম। বাসার ফ্রিজ থেকে মাংস আর সবজির মতো নষ্ট হয়ে যাবে এমন সবকিছু নিয়ে ন্ওেয়া হলো। দাদাবাড়ি পৌঁছে মা সেগুলো দিয়েই ঝটপট কিছু একটা রান্নাও করে ফেললো। ভাবছিলাম দাদা–দাদীর সঙ্গে হয়তো এটাই আমাদের শেষ একসঙ্গে বসে খাওয়া!

ইগরকে তিনটা মেসেজ দিয়েছিলাম। দেখা গেল, মেসেজগুলো ঠিকঠাক গেলেও ও এখনো পড়েনি। দাদী ছোট সাশার সঙ্গে খুনসুটিতে ব্যস্ত। আর আমি সারাটা সন্ধ্যা কাটালাম মেসেজগুলো সিন হয়েছে কিনা মিনিটে মিনিটে তা চেক করে।

দাদী আমাকে একটা সোনার চেইন আর তার সঙ্গে ম্যাচ করা কানের দুল দিলেন। ১৪ ক্যারেটের পাতলা চেইনটার সঙ্গে একটা দারুণ নকশার লকেট। লকেটের ঠিক মধ্যিখানে একটা স্যাফায়ার পাথর। কানের দুলগুলোর মধ্যেও আছে ওই পাথরের কুচি।

আমি জানি, দাদীর সারা জীবনে পরা সবচেয়ে দামি গয়নার সেট এটাই। ‘কিমোতে  পড়তে যাচ্ছিস। একটু ভদ্রমতো সেজেগুজে না থাকলে চলবে? , শখের গয়নাগুলো আমার হাতে দিতে দিতে বললেন দাদী।

বাড়ি ফেরার পথে কালকের জার্নির জন্য তেল নিতে তিনটা পেট্রল পাম্পে যেতে হলো আমাদের। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল নেই। দাচার চাবি নিতে একবার থামা হলো মায়ের খালার বাড়িতেও। বাসায় ফিরে শুতে যেতে বেশ রাত হয়ে গেল আমাদের।

সকাল ছয়টার দিকে বাসার কলিং বেল আর মোবাইল ফোন একসঙ্গে বেজে উঠল। ইগর। কলটা যে ও-ই করবে, সেটা আমি জানতাম। তবু বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তেই।

ইগর প্রায় কখনোই তিনতলা পর্যন্ত ওঠে না। নিচে থেকেই মিসকল দেয়। আজ আর নিচে অপেক্ষার ধৈর্য নেই ওর।

ইগরকে বাইরেই দাঁড় করিয়ে রেখে দুকাপ কফি বানালাম। তারপর কাপ হাতে দুজনে গিয়ে বসলাম অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের পেছনের লনে। সাশাকে ঘুম থেকে জাগাতে হলো দরজা বন্ধ করার জন্য।

ঝাড়া দুই সপ্তাহ পর দেখা হলো ইগরের সঙ্গে। এ কয়দিনে  গালভরা দাড়ি হয়েছে ওর। তবে এমন মরণপণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েও চোখ দুটো আগের মতোই সারল্যে ভরা। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দোনেৎস্ক সরকারের প্রশাসনিক ভবন দখল করার সময় ইগর ছিল স্রেফ দর্শক। আর এখন সেই বাহিনীরই একজন। ইগর রাশিয়ানদের চালানো তিন মাসের এক সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্পে আছে। এ যুদ্ধ যে খুব শিগগিরই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই তা ও ভালো করেই জানে।

আমার মন এক একবার চাইছিল ওকে যুদ্ধে না যেতে আবার জোরাজুরি করি। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছিল, তাতে লাভটা কী? এর মধ্যে তো অনেকবারই বললাম। আমার কথায় পাত্তাই দেয়নি ইগর। কাজেই শেষ পর্যন্ত কথাটা আর তুললামই না। যে কাজে কোন ফায়দা হবে না তার পেছনে আর দুজনের একসঙ্গে কাটানো শেষ মূহুর্তগুলো নষ্ট করা কেন!

চাইলেও যখন তখন ফোন করতে পারবে না ইগর। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের মোবাইল ফোন নাকি হয়ে উঠতে পারে শত্রু। শত্রুপক্ষ ফোন থেকে ওদের অবস্থান জেনে যেতে পারে। একজনের মোবাইলের জন্য বাহিনীর সবাই পড়ে যাবে ঝুঁকিতে। এ ছাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রিত এলাকা  থেকে বিচ্ছিন্নতাকামী কোন যোদ্ধাকে ফোন করলে আমিও ঝামেলায় পড়তে পারি। মনে হতে পারে আমি তাদের সাথে কোনভাবে যুক্ত। তাই ইগর বলেছে, যা বলার ইরাকে বলতে। বাড়ি এলে, কিংবা সুযোগ পেলে, ও ইরার কাছ থেকেই খবরগুলো জেনে নেবে।

ওহ, ইরা—ইগরের আইরিশ টুইন বোন। বয়সের পার্থক্য এক বছরেরও কম বলে ছোটবেলা থেকেই দুজনকে প্রায় যমজ বলেই মনে হতো। আমার কারণে ভাইয়ের মনোযোগ ভাগ হয়ে যাওয়াটা কোনোদিনই সহজভাবে নিতে পারেনি ইরা। এখন আমরা দুজনই ইগরের ‘আগ্রহ’ থেকে মোটামুটি বঞ্চিত। মেয়েটা হয়তো আমার সঙ্গে আর শত্রুতার ভাব দেখাবে না।

ইগর আমাকে একবারও ওর সঙ্গে থেকে যেতে বলেনি। বাবা–মাকে ছেড়ে থাকতে আমার কতটা কষ্ট হবে সেটা ভেবে নয় কিন্তু। ওর স্বভাবটাই আসলে এমন। একুশ বছরের ছেলেটা স্বভাবে চাপা ধরনের। মনটা মায়াভরা। হুটহাট কারো সম্পর্কে মত দিয়ে বসে না। মানুষের ভালোটাই আগে চোখে পড়ে ওর।

ইগর যেদিন প্রথম বললো ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিতে যোগ দিচ্ছে কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। ওর মতো নরম, নিরীহ গোছের ছেলে কীভাবে যুদ্ধে গিয়ে মানুষ মারবে? গুলি করতে হাত কাঁপবে না? বুকটা ভেঙে যাবারই তো কথা।

সাশা বেনিচকাকে নিয়ে এসেছে—এবার আমাকে ওর সঙ্গে কুকুরটাকে হাঁটাতে যেতে হবে। মা আবার জলদি বাসায় ফিরতে বলছে। রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি শেষ করতে আরও অনেক কাজ বাকি।

ইশ, মা যদি ইগরকে নাশতায় ডাকত! দোনেৎস্কে ইগরকে ফেলে যাওয়াটা আমার জন্য কতটা কষ্টের, সেটা মা বুঝতে পারে না—এমন না। আসলে মা নিজের মনের ঝড় সামলাতেই কাহিল। অন্য কারো দুঃখকষ্ট নিয়ে ভাবার অবস্থা তার এখন নেই।

দীর্ঘ বাইশটা বছর ধরে তিলে তিলে গড়া সংসারটা ফেলে অজানায় পাড়ি দিতে হচ্ছে মাকে। এই ঘরের প্রত্যেকটা জিনিসের আছে একেকটা গল্প। কোনটা কিনতে হয়তো দিনের পর দিন হা পিত্যেশ করতে হয়েছে। কোনটা কেনা হয়েছে ধারকর্জ করে। কোনো কোনো জিনিস আবার মনে করিয়ে দেয় নববর্ষের ডিনারে সেই ডিনার সেট বের করার ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তগুলো। কাঁটাচামচ থেকে শুরু করে ফ্রিজ পর্যন্ত—সবকিছুই এই ঘরের অংশ, কারণ মা একেকটা জিনিস নিজের হাতে বেছে এনেছে। বাইরে থেকে এগুলোকে নিছক প্রাণহীন জিনিস মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষের ব্যবহার আর স্পর্শে এগুলোর গায়েও স্মৃতি জমতে থাকে। তারা নিজেরা কিছু বলতে পারে না ঠিকই, তবে মন দিয়ে ছুঁয়ে দেখলে টের পাওয়া যায়—কত মানুষ, কত সম্পর্ক, কত মুহূর্ত জড়িয়ে আছে তাদের ভেতরে।

একটা ঘন্টা কেটে গেল বেশ দ্রুতই। সূর্য অনেকটা ওপরে উঠে গিয়ে বেশ রোদ ছড়াচ্ছে। ভোরের আলোর পেলব ভাবটা আর নেই। পাশের বাড়িগুলোর লোকজন হাই তুলতে তুলতে এসে দাঁড়াচ্ছে ব্যালকনিতে। আধা ঘুম চোখে সকালের টাটকা বাতাস নিচ্ছে বুক ভরে। একটু পরেই যে বাসে-ট্রামে পেটের ধান্দায় ছুটতে হবে।

রণাঙ্গনের গোলা দাগার শব্দ আস্তে আস্তে কমে এসেছে। কেন জানি না, রাত নামলেই গোলাগুলির তীব্রতা যেন বেড়ে যায়। সাশা বাবুর ধারণা, সে এই সামরিক কৌশলের রহস্য ভেদ করেছে। সেটা হচ্ছে: কোনো পক্ষই বিপক্ষের সেনাদের রাতে শান্তিতে ঘুমাতে দিতে চায় না।

রাতের গোলাগুলির একটা সুবিধাও আছে বেসামরিক মানুষের জন্য। গোলার নিরন্তর তর্জন-গর্জনের মধ্যেও একবার কোনোমতে ঘুম এসে গেলে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ানো আতঙ্কটা থেকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি মেলে। আসল কষ্টটা অনেক সময় বিপদে না, বিপদের অপেক্ষায়।

ইগর জানালো, আমরা রোজ যে গোলার আওয়াজ শুনি তা হচ্ছে ১৫৫ মিলিমিটার কামানের। এগুলোর পাল্লা নাকি ৩০ কিলোমিটার। আমাদের ফ্ল্যাটটা দোনেৎস্কের পশ্চিম অংশে। যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন থেকে মাত্র ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে আছি আমরা। সোজা কথায় তার মানে হচ্ছে, দুই পক্ষের অবস্থান যতদিন এমন থাকবে ততদিনেই সরকার–নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আমাদের ওপর যে কোন সময় গোলা পড়ার ভয় থেকে যাবে ।

বেঞ্চ থেকে উঠে বেনিচকাকে নিয়ে রাস্তার ধার বরাবর হাঁটা দিলাম আমরা। একটা জিনিস তখন খেয়াল করলাম। ইগর বা সাশা—কারও মুখেই আজ শাখতার দোনেৎস্কের নাম নেই। অথচ এই ফুটবল ক্লাবটাই ছিল তাদের আলাপের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। এমন দিন খুব কমই গেছে, যেদিন ওরা ফুটবল নিয়ে উত্তেজিত তর্কে মাতেনি। ডগলাস কস্তার বল পায়ে তীরের মতো ছুটে চলা কিংবা কোনো ম্যাচের বিতর্কিত গোল—তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতে পারত দুজন।

কিন্তু আজ ইগরের মাথায় ফুটবলের চিন্তা নেই। আরও অনেক জরুরি বিষয় ওর ভাবনায়। না ফাটা ল্যান্ডমাইন আর গোলা থেকে বাঁচার কায়দা শেখাল ইগর।

দোনেৎস্কের বন-জঙ্গল আর চাষের জমি এখন ভয়ংকর ল্যান্ডমাইনে ভরা। তার মধ্যে পুরনো আর নতুন দুই ধরনেরই আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৮০ বছর হলো। কিন্তু এখনো মাঝেমধ্যেই সেই সময়কার মাইন পাওয়া যায় এদিকটায়। তার ওপর আবার বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চলতি যুদ্ধের হাজারো মাইন আর তাজা গোলা।

দুটি মোদ্দা কথা শিখিয়ে দিল ইগর। এক, ঘাসের ওপর বা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটা যাবে না। দুই, পড়ে থাকা কোনো কিছু মাটি থেকে তোলা যাবে না। নিজের হাত থেকে পড়ে যাওয়া জিনিস ছাড়া আর কী। খুবই সিরিয়াস মনে হচ্ছিল ইগরকে। এমনকি কথাগুলো সাশার মনে আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ওকে আবার সব বলিয়েও ছাড়ল সে।

যুদ্ধ তো একান্তই কামান-বন্দুকধারী বুঝদার সেনাসামন্তের কারবার। কিন্তু চকচকে ক্লাস্টার বোমা বা অদ্ভুতদর্শন গোলার ধোঁকার শিকার নিষ্পাপ শিশুরাই হয় বেশি।

ইগর চলে গেল। আমরাও ফিরে এলাম বাসায়। ইগরকে কেন নাস্তা করতে সঙ্গে আনলাম না জিজ্ঞেস করল মা। কথাটা নির্দোষ কৌতূহল নিয়েই তা স্পষ্ট। কিন্তু আমি না শোনার ভান করলাম। আজ আসলে আমার আর কথা বলারই মুড নেই।

আগের প্ল্যান মতোই বাবা সকালে ব্যাংক খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে গেল। তবে ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল তার। দেরির কারণও আছে। ফেরার পথে সাশার স্কুলে ঢু মেরে ওর কাগজপত্রও নিয়ে এসেছে বাবা। যেটা আগে করার কথা ছিল না। বাবার এত দেরি দেখে মা তো সেই রকম খেপে গিয়েছিল। তবে স্কুলের কাজের বিষয়টা জেনে আর কথা বাড়াল না।

কিন্তু ব্যাংক থেকে ফেরার পর থেকেই দেখি বাবা নিজে রাগে ফুঁসছে। দেশি টাকা ভাঙিয়ে কয়েক মাস আগেও যে ইউরো বা ডলার পাওয়া যেত, আজ তার সিকিভাগও পায়নি। মহাবিরক্তি নিয়ে বাবা বলল,  ‘যুদ্ধ আমাকে এখনো না মারলেও ব্যাংকগুলো সে কাজ করে ফেলেছে।’

যাই হোক, দুপুরের খাবার শেষ হতেই আমরা গাড়িতে জিনিসপত্র তোলা শুরু করলাম। বাড়তি চাবি নিয়ে দাদু ভোরেই চলে এসেছিলেন। আমরা যেখানে যাচ্ছি সে জায়গাটা ১০০ কিলোমিটারও দূরে না। কিন্তু দাদু এমনভাবে গাড়ির অবস্থা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন, মনে হচ্ছিল গোটা ইউরোপ  পাড়ি দিতে যাচ্ছি যেন! ইঞ্জিন অয়েল, কুল্যান্ট, বেল্ট, হোসপাইপ, ব্যাটারি, ব্রেক ফ্লুইড, উইন্ডশিল্ডের পানি, টায়ারের চাপ— একটাও দেখতে ভুললেন না। তবে এতক্ষণ ধরে ঠিক কী করছিলেন, দাদু তা নিজেও হয়তো জানেন না।

 আমার মনে হলো বিদায়ের বেদনা চাপা দিতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখছিলেন গাড়ির পেছনে লেগে।

কঠিন খোলসের নিচে সাবেক কমিউনিস্ট এই মানুষটা আসলে এক আবেগের খনি। কয়েক বছর ধরে শনিবার এলেই বিকালে আমাকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে যেতেন। হাঁটতে হাঁটতে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে অর্থনীতি, পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদের রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ  হেন বিষয় নেই, যা দাদু আর আমার আলাপে উঠে আসত না।  কোনো সত্তর পেরোনো বুড়োর সঙ্গে আমার মতো পুঁচকে মেয়ের এ ধরনের ভাবগম্ভীর বিষয়ে আলাপ হতে পারে, তা অনেকের হয়তো বিশ্বাসই হবে না। কিন্তু দাদু সত্যিই আমার হিরো ছিলেন। ছিলেন কি? এখনো আছেন। ইগরের সঙ্গে ভাব হওয়ার পরেও শনিবারের বিকালটা তুলে রাখা ছিল দাদুর জন্যই।

দাদু আজ বাইরে আবেগ দেখাচ্ছেন না। কিন্তু আমি শিওর, সবাই চলে গেলে উনার বুকটা খালি হয়ে যাবে। আর যে কয়টা দিন বাঁচবেন সেই শূন্যতা আর পূরণ হবে না।

গাড়িতে মালপত্র তুলতে গিয়ে আমাদের জান বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। ভালো বড় সুটকেস ঘরে বেশি নেই। তাই বেশিরভাগ কাপড়চোপড় আর রান্নাঘরের জিনিস  ঠেসে ভরা হয়েছে বড় বড় কালো ময়লা ফেলার ব্যাগে। বাসায় খুঁজে পাওয়া গেছে শুধু একটা সুটকেস আর একটা ডাফেল ব্যাগ। আর আছে যার যার ব্যাকপ্যাক। আগে ছুটিতে ক্রিমিয়া বেড়াতে যাওয়ার সময় এগুলোতেই হয়ে যেত। কিন্তু এখন তো ঘটনা অন্যরকম।

যাই হোক, গাড়ির ট্রাংকে প্রথমে ঢুকল সুটকেস এবং সেলাই মেশিনটা। তারপর ভরা হলো ডাফেল ব্যাগ আর ব্যাকপ্যাকগুলো। তারপর এলো ময়লা ফেলার বস্তাগুলোর পালা। কোনাকাঞ্চি যা খালি ছিল সেখানেই ঠেসে ঢোকানো হলো সেগুলো। নাছোড়বান্দা মার চেষ্টার শেষ নেই। রান্নার খালি হাড়িপাতিলের ভেতরেও ময়দা, চিনি বা লবণের মতো কিছু না কিছুর প্যাকেট ভরেছে। সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে গোঁজা হয়েছে আবার কাপড়চোপড়। মোদ্দা কথা, ট্রাংকের প্রতিটি ইঞ্চিই কাজে লাগিয়ে ছেড়েছেন মা।

সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করছিল বালিশ, লেপ আর শীতের পোশাকের মতো গাব্দাগোব্দা জিনিসগুলো। শেষমেষ বালিশ আর জ্যাকেট-সোয়েটারের  ওপর বিছিয়ে দেওয়া হলো লেপ। এতে পেছনের সিটটা আরও একটু উঁচু হয়ে গেল। টেলিভিশনটাকে দুটি বিছানার চাদরে মুড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো সিটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায়। চারপাশে ঠেসে বসানো বালিশগুলোই টিভিটাকে সামলে রাখল। মা পথের জন্য নেওয়া খাবারগুলো রাখল তার পায়ের কাছে।

সাশা, বেনিচকা আর আমি বসব পেছনের সিটে। মালপত্রের জন্য আমাদের মাথা নির্ঘাত ছাদে গিয়ে ঠেকবে! শীতের পোশাকগুলো পেছনের ডেকে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। তাই পেছনের উইন্ডশিল্ড দিয়ে আর কিছু দেখা যাবে না। তার মানে কি, দোনেৎস্ককে একেবারেই ছেড়ে যাচ্ছি আমরা? আর পেছনে ফিরে তাকানোরও দরকার নেই? নাহ্, আমি মনে হয় একটু বেশি বেশিই ভাবছি!

বাবা গাড়ির সাইড মিররগুলো নেড়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন। পেছনের উইন্ডশিল্ড জিনিসপত্রে ঢাকা পড়লেও মিরর দিয়ে অন্তত পাশের দৃশ্য দেখতে পারবে।

আশ্চর্য ব্যাপার, এত জিনিসপত্র সবই শেষ পর্যন্ত ধরে গেল গাড়িতে! এতেই শেষ না। দেখা গেল, এখনো গাড়ির ছাদটা খালি। মা তো মহাখুশি। এবার তাহলে তার প্রিয় ফ্রিজটার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বাবা অবশ্য প্রায় ধমক দিয়ে তার উৎসাহ নিভিয়ে দিলেন— ‘কী যে বলো তুমি! ফ্রিজটাকে ছাদে শুইয়ে রাখলে কম্প্রেসারের সব তেল কুলিং লাইনে চলে যাবে না? ভেতরে একবিন্দু ঠান্ডা হবে না আর। জিনিসটা স্রেফ একটা কাঠের বাক্স হয়ে যাবে।’

মা কোনো তর্কে গেলেন না। পদার্থবিদ্যা নিয়ে আলাপে তার কখনো বাবাকে চ্যালেঞ্জ করার কথাও না। তার শ্বশুরের মতো স্বামীটিও যে ইঞ্জিনিয়ার।

মা অবশ্য হাল ছাড়ার মানুষ না। ঠিক করলেন ফ্রিজ না হোক, ছাদে জাজিম দুটি বেঁধে নেবেন। এতক্ষণ বেশিরভাগ ভারী জিনিসপত্র বাবা একাই টানাটানি করছেন। কিন্তু তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে জাজিম নামানোর জন্য তাকে দাদুর সাহায্য নিতেই হলো। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, গাড়িটার চেহারা হয়েছে মরু কাফেলার মালপত্রের বোঝায় কাহিল উটের মতো।

মালসামানা তোলার কাজ শেষ। এবার শুধু গাড়িতে উঠে বসা বাকি। তার আগে একটা কাজের জন্য ঘরে ফিরলাম সবাই। কাজটা আর কিছুই না, ঘরের ভেতর স্রেফ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। স্লাভদের একটা পুরনো রীতি এটা— সিয়েস্ত পেরেদ দারোগয়। দূরের পথে যাত্রা করার আগে খানিকক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে মনটাকে গুছিয়ে নেওয়াই হচ্ছে সিয়েস্ত পেরেদ দারোগয়। সাধারণত এ সময় কিছু ফেলে যাওয়া হলো কি না, তা শেষবার দেখা আর শুভযাত্রার জন্য প্রার্থনা করে লোকে।

ভাবগম্ভীর পর্বটা শেষ হলে আমরা একে একে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। মা বেরোলেন সবার শেষে। চোখভরা জল। বুকের ওপর ক্রুশচিহ্ন এঁকে মা দরজায় তালা দিলেন। তারপর চাবিটা তুলে দিল দাদুর হাতে।

বাবা আর দেরি না করে গাড়ি ছেড়ে দিল। রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম, দাদু হাত নেড়েই চলেছেন। আয়নায় ক্রমে ছোট হতে হতে হারিয়ে গেলেন তিনি। শহর ছেড়ে যতই দূরে যাচ্ছি, ততই রাস্তার দুপাশের খ্রুশ্চোভকা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলো কমে আসছিল। বসতবাড়ির জায়গা নিল কংক্রিট আর মরচে পড়া ধাতব জঙ্গল। মাইলকে মাইল চলল এ দৃশ্য।

Khrushchevka II-35. Facade diagram

 দোনেৎস্কের একসময়ের বিখ্যাত ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবশিষ্ট বলতে এ-ই আছে এখন। নিশ্চল, , নিশ্চুপ। অথচ একসময় এই জায়গাগুলো ছিল নানান ছন্দের শব্দময় প্রাণবন্ত এক পৃথিবী। যন্ত্র আর মানুষ— দুয়ের মিলেমিশে তৈরি করা একটানা শব্দের বুনন। যন্ত্রের ছন্দময় ঘটঘটাং, ক্যান্টিনে শ্রমিকদের আড্ডার হৈ-হল্লোড় আর দূরে কোথাও চলতে থাকা কনভেয়ার বেল্টের নিরন্তর গুঞ্জন। সেইসব ছবি আর শব্দ এখন কেবলই স্মৃতি। দোনেৎস্ক ছেড়ে গ্রাম এলাকায় ঢোকার সময় বিদ্রোহীদের হাতে থাকা প্রথম সামরিক চেকপোস্ট পার হয়েছি আমরা। দোনেৎস্কের আশপাশের এই গ্রামাঞ্চল নিয়ে বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। আমার যে বন্ধুরা পশ্চিম ইউক্রেন গিয়েছে, তাদের মুখে সেখানকার সৌন্দর্যের প্রশংসার শেষ নেই। আমি নিজে কখনো সেখানে যাইনি। ইউক্রেন নিয়ে আমার ভৌগোলিক জ্ঞান একেবারেই কম— দক্ষিণে ক্রাইমিয়া, পশ্চিমে দনিপ্রোপেত্রোভস্ক আর উত্তরে খারকিভ; এই হচ্ছে আমার দৌড়। আকাশ-পাতাল এমনসব ভাবনা ভিড় করছিল মনে। হঠাৎ ভারী অস্ত্রশস্ত্র হাতে থাকা একদল যুবককে দেখে যেন বাস্তবে ফিরলাম। যুবকরা ইশারা করে আমাদের গাড়ি থামাল। হাতে অস্ত্র থাকলেও সবার পরনের পোশাক বেসামরিক। আশপাশে জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই। এরা কারা, কোত্থেকে এলো? সবাইকে ঘিরে ধরল ভয়। মুখ ফ্যাকাশে।

একে আশপাশে জনবসতি নেই, তার ওপর অস্ত্রধারীদের পরনে ইউনিফর্ম না থাকা ভয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাবা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে ওদের সঙ্গে কথা বলল। ভাগ্য ভালো, দুয়েকটা হালকা প্রশ্ন করেই আমাদের ছেড়ে দেওয়া হলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা। পথে এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধারা কোনো সমস্যা করেনি। বাবাকে এখনো ভানিয়া আঙ্কেলের পরিচিত সেই লোকদের নামও বলতে হয়নি। আমরা যেখানে থাকব, সেই দাচাটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে একের পর এক কল্পনার ফানুস ওড়াচ্ছিল সাশা। বেচারা পরে না বেশি হতাশ হয়, সে জন্য বাবা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল। জানাল, অনেক দিন ধরেই সেখানে নিয়মিত কেউ থাকে না। মায়ের খালাতো ভাইবোনেরা কখনো-সখনো একবেলার জন্য বেড়াতে যায় মাত্র। ‘মনে করো, আমরা সামার ক্যাম্পে যাচ্ছি, সাশা। ওখানে তো বেশিদিন থাকব না,’ বলল বাবা।

কয়েকটা পুরনো, বাতিল কয়লা খনি পেরিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। প্রতিটি খনি এলাকার মধ্যে অদ্ভুতরকম মিল। খুঁড়ে জমিয়ে রাখা মাটির উঁচু উঁচু ঢিবি। কিছুটা পিরামিডের মতো দেখতে। পাশের গর্তগুলোতে পানি জমে লেকের চেহারা নিয়েছে। রোদ পড়ে ঝলমল করছিল লেকের পানি। চারপাশের ম্লান, বিবর্ণ পরিবেশের বিপরীতে চোখে পড়ারই মতো দৃশ্যটা।

দূরে খনি শ্রমিকদের ঘরবাড়ির ভাঙাচোরা অবয়ব চোখে পড়ছিল— পরিত্যক্ত, বিস্মৃত। কে বলবে এইসব ঘরে একসময় ছিল সুখে-দুঃখে ভরা সংসার! কে জানে কতদিন খালি পড়ে আছে। জানালার পাল্লা ভাঙাচোরা। দরজাগুলো হাট করে খোলা।

ইউক্রেন সেনাবাহিনীর লোকেরা দেখলাম পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর একটাতে ক্যাম্প করেছে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঢোকার পর এটাই আমাদের সামনে পড়া প্রথম চেকপয়েন্ট। ক্যাম্পের লোকেরা ইশারা করায় গাড়ি থামাল বাবা।

পেছনে তাকিয়ে বাবা আমাদের জানিয়ে দিল, সেনাদের সঙ্গে কথা বলার দরকার হলে সে-ই তা করবে। তাকে সাহায্য করারও দরকার নেই। গাড়ি থামানোর পর বাবাকে নামতে বলা হলো। এক তরুণ সেনা মিনিট কয়েক ধরে এটা-সেটা জানতে চাইল তার কাছে। আরও দুজন আমাদের গাড়ির ট্রাঙ্কে থাকা মালপত্রগুলো ঘেঁটে দেখছিল। বাবা গাড়িতে ফিরে এলে আগের সেনাটাই এবার সাশাকে নামতে বলল।

শুনেই ‘না না’ বলে উঠল মা। তরুণ সেনাটা ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মা সাশার সঙ্গে যেতে চাইল তখন। কিন্তু সেনাটা মানা করল। জানাল, সাশাকে দূরে কোথাও নেওয়া হবে না।

হলোও তাই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলো সাশা। বলা হলো, এবার নিজেদের গন্তব্যে রওনা হতে পারি আমরা। সাশার জন্য কিন্তু তরুণ সেনার জেরা করার অভিজ্ঞতা মনে হলো এক মহা আনন্দের ব্যাপার। আমার ছোট ভাইটি এটা নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। তাকে সেনার করা প্রশ্নগুলো ছিল খুবই সাধারণ। ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছো?’, ‘গাড়ির ভেতরে কী আছে?’, ‘তোমাদের পরিবারে মানুষ কয়জন?’, ‘তোমাদের বাড়ি কোথায়?’ এইসব সাধারণ জিজ্ঞাসা। আসল বিষয়টা হলো, বাবা আর সাশা একই রকম উত্তর দেয় কিনা, তা মিলিয়ে দেখা। ভাগ্য ভালো, সাশা ইগরের কথা বলে বসেনি।

অনেক দুশ্চিন্তা করলেও আমাদের যাত্রা অন্তত এখন পর্যন্ত মোটের ওপর ঝামেলাহীন। সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঢোকার পর অবশ্য আরও কয়েকবার গাড়ি থামানো হয়েছে। তবে বাবাকে শুধু আইডি কার্ড দেখিয়ে আমাদের গন্তব্যের কথা জানাতে হয়েছে। অবশেষে আমরা ভলনোভাখায় পৌঁছলাম।

ছোট একটা শহর। একটাই বড় রাস্তা। আমরা যেখানে যাচ্ছি, তা এখান থেকে গাড়িতে ১০ মিনিটও না। কয়েকটা পানির বোতল আর কোল্ড ড্রিংকস কিনতে একটা দোকানে থামল বাবা। মা সঙ্গে করে যথেষ্ট রুটি, কোলবাসা, চিজ, সালো, টমেটো আর শসা নিয়ে এসেছিল। দাচার গ্যাসের চুলা যদি কাজ না করে, সেটি ভেবেই তার এই প্রস্তুতি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি দাচার মেইন গেটে থামল।

বাবা শক্তপোক্ত লোহার গেটটা খুলে আধা-পাকা ড্রাইভওয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। গাড়িটা পার্ক করা হলো বাড়ির পেছনে। সাফ-সুতরো করার পর ঘরের কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে। মালপত্র নামিয়ে ভেতরে নেওয়া সহজ হবে তাতে। দাচার পেছনের উঠোনটাকে মনে হলো ভাঙাচোরা লোহা-লক্কড়ের ভাগাড়। মরচে পড়া ভাঙা জানালার পাল্লা, বেড়ার অংশ, এমনকি একটা আস্ত পুরনো বিদ্যুতের খুঁটিসহ রাজ্যের জঞ্জাল পড়ে আছে। দেখে মনে হয়, ছোটবেলায় মায়ের খালাতো ভাইবোনদের এই জায়গাটা এত খাটিয়েছিল যে তারা এখনো সেটি পুরোপুরি ভুলতে পারেনি। তাই জমিটা এভাবে চরম অনাদরে ফেলে রেখেছে। নাকি এটাই দোনেৎস্কের শিল্পশ্রমিকদের স্বভাব? চাষের জমির চেয়ে হয়তো শিল্পকারখানাকেই তারা শ্রদ্ধাভক্তি করে বেশি। উঠানটার অনুভূতি শক্তি থাকলে সে চরম অভিমান করত, সন্দেহ নেই। বিপদের দিনে এ জমিটুকুই পরিবারের সবাইকে খাবার জুগিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। আর দুঃসময় কেটে যাওয়ার পর তাকেই এমন অবহেলায় পড়ে থাকতে হলো।

দাচার পেছনের উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো ভলগা—দায়িত্ব থেকে বহু আগেই অবসর নিয়েছে গাড়িটা। এখন বুনো ঘাস, ঝোপঝাড় আর পোকামাকড়ের সঙ্গে তার শান্তিপূর্ণ বসবাস। নৈরাশ্যবাদীরা হয়তো বলবে, উদ্ধারের উপায় না থাকলে জায়গাটাকেই আপন করে নেওয়াই ভালো।

চারদিকে অবহেলার ধুলো মেখে ছড়িয়ে থাকা বাকি জিনিসপত্রগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। কয়েকটা ফলের গাছ টিকে আছে এদিক ওদিক। কিছু বেখাপ্পা চেহারার ফলও ধরেছে তাতে। একটা নাশপাতিতে কামড় বসিয়ে মনে হলো বালু খাচ্ছি। আপেলগুলো লেবুর মতো টক!

এই অস্বস্তি জাগানিয়া দৃশ্যের মধ্যে একমাত্র আরাম দিচ্ছে বুনোফুলগুলো। ফলের গাছগুলো যখন অবহেলায় দিশেহারা, ফুলের গাছগুলো তখন ঠিকই আপন মনে মেলে ধরেছে ভালোবাসার পসরা।

ভলগা গাড়িটার উল্টোদিকের কোনায় রয়েছে একটা টয়লেট। হ্যাঁ, টয়লেটই বটে! দাচায় বাড়ির ভেতরে গোসলের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু টয়লেটটা বাইরেই। ব্যবহার করতে হলে অনেকখানি হেঁটে উঠানের পেছনে একেবারে শেষ মাথায় যেতে হবে। টয়লেটটা একেবারেই সাধারণ। দেয়াল আর দরজা কাঠের। মাথার ওপর টিনের ছাউনি, তবে বাতাস ঢোকার জন্য ওপরের দিকে খানিকটা ফাঁক রাখা। মেঝে বলতে একটা কাঠের পাটাতন। তারই মাঝখানে আসল কাজটা সারার জন্য আয়তাকার এক গর্ত। প্যান বা কমোডের কারবার নেই। চারপাশে ভনভন করছে মাছি! খুটিয়ে দেখতে কাছে যেতেই উৎকট গন্ধ আর মাছির ওড়াওড়িতে আমার প্রায় বমি এসে গেল।

আমার মুখ থেকে সম্ভবত আর্তচিৎকারের মতোই আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল একটা। তা শুনে বাবার বুঝতে দেরি হয়নি ঘটনা কী! আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে তাই টয়লেটের দিকে একরকম দৌড়েই এলো সে।

জীবনে এই প্রথমবারের মতো মরতে ইচ্ছা হচ্ছিল আমার। রোজ এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? কথাটা ভাবতেই মাথার ভেতরটা আবার কেমন করে উঠল। এইভাবে বেঁচে থাকার নাম জীবন তাহলে!

বাবা চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিল আমাকে। দূরে দাঁড়ানো মার ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি। সেখান থেকেই গলা চড়িয়ে বলল, ‘নাটক বন্ধ করো তো মাশা! তোমার একার কি অসুবিধা হচ্ছে নাকি? এখানে তো বেশিদিন থাকতে হবে না তোমাকে। ভাগ্য ভালো যে, আমরা একটা আস্ত দাচা পেয়েছি। জানো, ক্রামাতোর্স্ক আর স্ভিয়াতোহির্স্কে যাওয়া লোকজন থাকছে ছোট ছোট কেবিনে গাদাগাদি করে। ৫০ জন লোকের জন্য একটা কমন টয়লেট সেখানে!’

আসলে এই হচ্ছে আমার মা! খনিকর্মীর মেয়ে বলে কথা। দুঃখকষ্ট তাকে খুব একটা টলাতে পারে না। অল্প বয়সে কারখানায় কাজ করতে গিয়ে কম কষ্ট সইতে হয়নি তাকে। তাই জীবনের অন্যায়-অবিচার তার গা-সওয়া।

বাবা গাড়ি বের করল ভলনোভাখায় যাওয়ার জন্য। ঘরের ইলেকট্রিক্যাল কাজের কিছু জিনিস কেনা দরকার তার। আমিও পিছু ধরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। সাশারও মতলব ছিল সঙ্গে জোটার। কিন্তু মার চাহনি দেখেই তার শখ মিটে গেলো।

শহরে ঢোকার পর পাওয়া প্রথম ক্যাফেতেই থামলাম আমরা। আমি প্রথমেই ঢুঁ মারলাম টয়লেটে। বেরিয়ে দেখি, বাবা একটা টেবিলে বসতে না বসতেই তাকে ঘিরে ধরেছে একদল মানুষ। বেশিরভাগই বয়স্ক লোক। দোনেৎস্কের সর্বশেষ খবর জানতে চাইছে তারা। চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ। আবার কবে নিজেদেরই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয় সে ভাবনাও ভোগাচ্ছে তাদের।

কয়েকটা বাল্ব, কিছু তার আর সুইচটুইচ কিনে বাড়ি ফিরলাম আমরা। রান্নাঘর আর বাথরুমে পানি সাপ্লাইয়ের পাম্পটার ওয়্যারিংয়ের সমস্যা আছে। বাবা ইঞ্জিনিয়ার বলে এটা ঠিক করা তার জন্য ব্যাপারই না। ইংলিশ কমোড কেনা হলো না। এখানে দাম খুব বেশি। বাবা বলল, দরকার হলে মারিওপোল গিয়ে কেনা যাবে। মা’রও সেলাইয়ের কিছু জিনিসসহ ঘরের জন্য এটা সেটা দরকার। তাই ভলনোভাখায় পকেট খালি না করে একবারে মারিওপোল গিয়ে বেশি করে কেনাকাটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ভাগ্য ভালো বলতে হবে, চুলার গ্যাসের লাইন চালু আছে। কাজেই রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে হবে না। ফ্রিজ অবশ্য নাই। তবে তা নিয়ে মোটেই চিন্তিত দেখলাম না মাকে। রান্নাঘরের নিচের সেলারের ভেতরটা ওপরের তলার তুলনায় অনেক ঠাণ্ডা। বেচে যাওয়া সব খাবার সেখানেই নিয়ে রেখে দিল মা।

রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। সাশা বা আমি কেউই ভেবে পাচ্ছিলাম না, কী করে সময় কাটাবো। আমরা তো এত আগে ঘুমাইনা। বাড়ির ভেতরে চার জায়গায় চারটা লাইট জ্বলছে। বাবা একটু আগেই বাড়ির পেছনের টয়লেটের কাছে একটা লাগিয়েছেন। তা ছাড়া চারদিকে আলো বলতে কিছু নাই। চাঁদও তেমন আলো দিচ্ছে না। দাচার বাইরের রাস্তা আর আশপাশের বাড়িগুলোতেও ভুতুড়ে অন্ধকার। আশেপাশে মানুষজন বলতে আদৌও কেউ আছে কি! এখানে আসার পর থেকে একটা প্রাণীকেও দেখি নাই আমরা।

মোবাইলের নেটওয়ার্কের দেখলাম জঘন্য অবস্থা। কোনমতে মেসেজ দেওয়া চলে। নেট ব্রাউজ করার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের সবার ভলনোভাখায় আসা নিয়ে ইরার সঙ্গে আমার হাল্কা আলাপ হয়েছিল। ও কথা দিয়েছিল যত তাড়াতাড়ি পারে ইগরের কাছে খবরটা পৌঁছে দেবে।

সাশা মোবাইলের নেট দিয়ে আমার ল্যাপটপে কাজ করার জন্য ঘ্যান ঘ্যান শুরু করল। নেটের অবস্থা যা তা- এ কথা যে তাকে কতবার বললাম, হিসাব নাই। সে তার মতো বলেই চলল এক কথা।

ঝামেলার এখানেই শেষ না, আমার ফোনের ডেটাও ফুরিয়ে যাচ্ছে। কাল মা আর বাবা মারিউপোল রওয়ানা হওয়ার পর সাশাকে নিয়ে আমি মোবাইলে ডেটা ভরতে ভলনোভাখায় যাবো বলে ঠিক করলাম। জায়গাটা কাছেই, হেঁটেই যাওয়া যাবে।

আমাদের কাছে ল্যাপটপ একটাই। সেটা মূলত আমিই চালাই। মা চায়, আমি যেন এটা দাচাতেই রেখে যাই। বাবা আর আমি কিয়েভে পৌঁছানোর পর আমার জন্য নতুন একটা ল্যাপটপ কেনা হবে। দাদু আমাকে খামে ভরে যে টাকাটা দিয়েছিল তা দিয়েই কেনা হবে নতুন ল্যাপটপটা।

এখানে আসার পর থেকে বেনিচকা প্রায় পুরো সময় শেকলে বাঁধা রয়েছে। কাল আমি আর সাশা উঠানের ঝোপঝাড় আর আগাছা পরিস্কার করতে নামবো। ওই জংলা ঘাস আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে বেনিচকার জন্য কী বিপদ লুকিয়ে আছে কে জানে! এত ঝোপজঙ্গল সাফ করতে জান বেরিয়ে যাবে। তবে এমনিতে আলসের হাড্ডি সাশা তার প্রিয় কুকুরের ভালোর জন্য জান দিতেও আপত্তি করবে না।

সবাই মিলে হাত লাগানোয় দিনদুয়েকের মধ্যেই দাচাটা মোটামুটি বাসযোগ্য হয়ে উঠলো।

বাবা সেই মারিউপোল থেকে ইংলিশ স্টাইলের কমোড নিয়ে এসেছে। ল্যাট্রিনের মেঝেটা বাড়তি তক্তা দিয়ে মজবুত করা হলো। কাঠের দেয়ালে লাগানো হলো মাছি তাড়ানোর এক ধরনের জীবাণুনাশক। জিনিসটার গন্ধ বেশ তীব্র, কিন্তু মাছি দূরে রাখতে পারলে আমি গন্ধ সইতে রাজি। বাবা ল্যাট্রিনের ভেতরেও একটা লাইট লাগিয়ে দিলো, আর সুইচটা বাইরে—ব্যাপারটা বেশ সুবিধার। উঠোনজুড়ে লম্বা একটা বাগানের পাইপ টেনে এনে ফ্লাশে পানি ভরার ব্যবস্থাও করে ফেলেছে বাবা।

মারিউপোল থেকে মা এনেছে ঘরের জন্য দরকারি টুকটাক জিনিসপত্র আর কিছু ফিতা ও কাপড়। দাচা গোছগাছ করা শেষ হলেই সে তার পোশাক কাটছাট প্রকল্পে মন দেবে। নিজের শখের সুন্দর পোশাকগুলো আমার জন্য অল্টার করবে। এজন্য হাতে সময় আছে আর দুই সপ্তাহ। তারপরই বাবার সঙ্গে কিয়েভ যাবো আমি।

এই প্রায় পোড়ো গ্রামে আমাকে ছাড়া সাশা কী করবে তা ভেবে কুল পাচ্ছি না। দোনেৎস্কে ওর নিজের একটা ছোট্ট জগৎ ছিল—বন্ধু ছিল, খেলার মাঠ ছিল, নিজের মতো ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা ছিল।এখানে ওর সমবয়সী ছেলেপেলে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ইউক্রেনের গ্রামের বাসিন্দা বলতেই মূলত বুড়োবুড়ি আর তাদের পোষা কুকুর।

সমবয়সী বাচ্চাদের দেখা পেতে সাশাকে সম্ভবত পয়লা সেপ্টেম্বরের ‘জ্ঞান দিবস’ পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে। ইউক্রেনে এ দিবস এক বিশাল ব্যাপার—বাচ্চারা নিজের পছন্দমতো সাজগোজ করে শিক্ষকদের জন্য ফুল নিয়ে আসে স্কুলে। পরিবারের সদস্যদেরও সঙ্গে আনতে পারে তারা। সবার শুরুতে সকালে একটি স্বাগত অনুষ্ঠান হয়। ‘ফার্স্ট বেল’ অনুষ্ঠান দিয়ে নতুন স্কুলবর্ষকে স্বাগত জানায় সবাই। বড় ক্লাসের শিক্ষার্থীরা ছোটদের সাহায্য করে এতে।

আমি মনে মনে খুব করে চাইছি সাশা যেন জলদি নতুন বন্ধু পেয়ে যায়। জায়গাটাকে যেন নিজের মনে করে নিতে পারে। তার আগে অবশ্য স্থানীয় হাই স্কুলের ওকে ভর্তি নিতে রাজি হতে হবে। বাবা আর মা কাল স্থানীয় কাউন্সিল আর রাইওন প্রশাসনের অফিসে যাবে। সাশার স্কুলে ভর্তি-সহ সব আনুষ্ঠানিক কাজ সেরে আসার ইচ্ছা তাদের।

আজ সাশা আর আমি বেনিচকাকে নিয়ে মোবাইল নেট ভরতে গিয়ে ভলনোভাখা এলাকাটা ঘুরে দেখলাম। একটু ঘুরতেই টেলিভিশনের নেটওয়ার্ক আর ইন্টারনেটের মডেম ইনস্টল করার একটা দোকান পেলাম আমরা। বাবা কাল সকালে এখানে ঢুঁ মারলে বিকেলের মধ্যেই টিভি আর ইন্টারনেট দুটোই চালু হয়ে যেতে পারে দাচায়।

মা আজকাল টাকা পয়সা খরচ করা নিয়ে খুঁতখুত করছে। কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া কি আর এখন চলে! তাই শেষ পর্যন্ত সে এতে বাগড়া দেবে না বলেই মনে হয়।

বড় খরচ আসছে দুই সপ্তাহ পর – যখন বাবা আমাকে ডর্মে তুলে দিয়ে আসার জন্য কিয়েভে নিয়ে যাবে। বাবা-মার সঞ্চয়ের যেটুকু বাকি আছে তার একো বড় অংশ শুধু আমাকে একটু গুছিয়ে রেখে আসতেই চলে যাবে। ইদানিং ট্রেনের টিকিটের দামও এত বেড়েছে! শুধু যাতায়াতেই একগাদা টাকা বেরিয়ে যাবে।

এখান থেকে কিয়েভ যাওয়ার জন্য উপায় দুটো। যেটাতে খরচ বেশি সেটা হচ্ছে তিনঘন্টার বাস জার্নি করে প্রথমে জাপোরিঝিয়া গিয়ে সেখান থেকে হাইস্পিড আন্তনগর ট্রেনে রাজধানী। এ পথে মোট লাগে ১১ ঘন্টার মতো। আর সস্তার কায়দা হচ্ছে মারিউপোল থেকে রাতের ট্রেন ধরা। তবে তাতে সময় লাগে অনেক -প্রায় ১৯ ঘন্টা। আমরা পরের পথই নেবো বলে ঠিক করলাম। সময় বেশি লাগলেও বেশ কিছু পয়সা বাঁচবে এই দুঃসময়ে।

 ইউক্রেনে আমার বয়সী বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই এমন দূরত্বে একাই চলাফেরা করে। যুদ্ধ না চললে বাবা হয়তো আমাকেও একাই কিয়েভ যেতে দিতো। তাছাড়া আমি যে এখনো দোনেৎস্ক ছেড়ে চলে আসার ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারি নাই সেটা বাবা-মা দুজনেই জানে। এজন্য তারা যতটা পারছে কাছে থাকছে আমার। কিয়েভেও আমাকে দেখে শুনে রাখার লোক ঠিক করা হয়েছে এরই মধ্যে! তারা হচ্ছেন মা’র বন্ধু দাশা আন্টি আর তার স্বামী ভ্লাদ আঙ্কল।

মা’র ছোটবেলার বন্ধু দাশা আন্টির মতো মানুষ হয় না! উনাদের আদিবাড়ি দোনেৎস্কে। তবে এখন স্বামী আর তিন বাচ্চাকে নিয়ে কিয়েভে থাকেন।

ভ্লাদ আঙ্কল কাজ করেন একটা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানে। উনি কিয়েভ সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে এসে আমাদের রিসিভ করবেন বলে কথা হয়েছে। আমরা ওদের ফ্ল্যাটেই দুতিনদিন থাকবো। আমার কিমোর ছাত্রাবাসে ওঠার সব ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আর কী!

প্রথমদিন আঙ্কল ভ্লাদই বাবা আর আমাকে নিয়ে গেলেন কিমোতে। তার ঘন্টাদুয়েক দেরি হয়ে যাবে কাজে যেতে। তবে এ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত মনে হলো না আঙ্কলকে। নিজের সুপারভাইজারের সঙ্গে নাকি তার বেশ খাতির। এ-ও জানা গেলো ভদ্রলোক উগাণ্ডার মানুষ।

পরের দিন আমি আর বাবা নিজেরাই গেলাম ক্যাম্পাসে। আগের দিনের বাকি থাকা প্রশাসনিক কাজগুলো সেরে আমরা গেলাম এক ইলেকট্রনিক্সের দোকানে। দাদার দেওয়া টাকা দিয়ে একটা ল্যাপটপ কেনা হলো সেখান থেকে। খুব দামি না হলেও ল্যাপটপটা চলনসই। জিনিসটা পেয়ে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফুটছিলাম আমি। এটাই আমার প্রথম একান্ত নিজের ল্যাপটপ যে! ঠিক করলাম, এখানে না, হলে গিয়ে তারিয়ে তারিয়ে বক্সটা খুলবো। দুয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে সেজন্য। তা লাগুক। এতদিন পর সত্যি সত্যি নিজের একটা ল্যাপটপ! চকচকে ব্রান্ড নিউ মেশিনটা প্যাকেট খুলে কীভাবে ছুঁয়ে দেখবো সেটা ভাবতেই খুশিতে কেমন যেন লাগছে আমার।

দিনচারেক পর বাবা মারিউপোলের পথে রওয়ানা হলো আবার। হলে উঠে গুছিয়ে নিয়েছি এর মধ্যে। মাথা থেকে অনেক ভারি একটা বোঝা নেমে গেছে বাবার। বিচ্ছিন্নতাবাদী এলাকার মানুষ বলে আমার ভর্তি হতে ঝামেলা হতে পারে বলে দুশ্চিন্তায় ছিল মা-বাবা দুজনেই। কিন্তু সবকিছু এত ঝামেলাহীনভাবে হয়ে গেল যে আমরা দুজনেই তাজ্জব।

আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে হল একেবারেই কাছে। হাঁটলে মিনিটপাঁচেক। আরেকজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে হবে আমাকে। আমার রুমমেট কাতিয়া। ও পড়ে সেকেন্ড ইয়ারে। ওর আগের রুমমেট পড়াশোনার মাঝপথে বিয়ে করে ফেলেছে। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ডিপ্লোম্যাট স্বামীর সঙ্গে সে এখন জেনেভা থাকে।

আমার রুমটা তিনতলায়। সবচেয়ে বড় সুখবর হলো, প্রতিটি কক্ষের সঙ্গেই আলাদা বাথরুম আছে। খারকিভের ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া আমার দুই স্কুলের বন্ধুর কপাল অতো ভালো হয়নি। ওদের ডর্মে প্রতিটি তলার এক প্রান্তে কমন বাথরুম। মানে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। সকালের তাড়ার মধ্যে বাথরুমে যেতে লাইন ধরতে হবে না এটা বুঝে নিজেকে বেশ ভাগ্যবানই মনে হচ্ছিল।

রুমের ভেতরটা সাদামাটা কিন্তু ভদ্রস্থ। দুটো সিঙ্গেল খাট, দুটো ছোট পড়ার টেবিল আর চেয়ার, আর শীতের মোটা কোট ঝুলিয়ে রাখার মতো জায়গাসহ একটা বড় বিল্ট-ইন আলমারি। ঘরে একটাই জানালা, দরজার ঠিক বিপরীতে। সকালে সেই জানালা দিয়ে রোদের আলো ঢুকে ঘরটাকে যেন দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। অদৃশ্য একটা রেখা টেনে দেয়—আমাদের দুজনের জিনিসপত্রের মাঝখানে, আমাদের দুজনের জীবনের মাঝখান